Light
Dark

শেরপুরে অস্তিত্ব সংকটে ঐতিহ্যবাহী চাতাল শিল্প, কর্মহীন হাজারো শ্রমিক

একসময় দেশের অন্যতম খাদ্য উদ্বৃত্ত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত শেরপুরে ধানকেন্দ্রিক চাতাল শিল্প ছিল স্থানীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ব্রিটিশ আমল থেকে গড়ে ওঠা এই শিল্পে একসময় জেলার পাঁচ উপজেলায় প্রায় এক হাজার ১০০টি চাতাল ছিল। তবে আধুনিক অটো রাইস মিলের বিস্তার, স্বল্প পুঁজি, ব্যাংক ঋণের চাপ এবং নানা প্রতিকূলতায় বর্তমানে এ শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। এর ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো নারী-পুরুষ শ্রমিক।

চাউলকল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, এক যুগ আগেও শেরপুরের পাঁচ উপজেলায় অন্তত এক হাজার ১০০টি চাতাল চালু ছিল। বর্তমানে কোনো রকমে টিকে আছে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০টি চাতাল।

স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হতো চাতালের কর্মচাঞ্চল্য। ধান ভাঙার শব্দ, ধান সিদ্ধের ধোঁয়া এবং নতুন চালের ঘ্রাণে মুখর থাকত পুরো এলাকা। দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় শহরের চালের আড়তগুলোতে জড়ো হতেন চাতাল মালিকরা। শেরপুর শহরের বটতলা, ঢাকলহাটি, দিঘারপাড়, শেখহাটি, বাড়বাড়ী, নারায়ণপুর, খোয়ারপাড়, কালীগঞ্জ, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নকলা ও নালিতাবাড়ীজুড়ে ছিল চাতাল শিল্পের ব্যাপক বিস্তার। এখন সেই চিত্র অতীত।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০০৭-০৮ সালের পর থেকে চাতাল শিল্পের পতন শুরু হয়। বৃহৎ পুঁজির অটো রাইস মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একের পর এক চাতাল বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের বোঝাও অনেক মালিককে চরম সংকটে ফেলে। কেউ দেশ ছেড়েছেন, কেউ পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, আবার কেউ রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ঋণের চাপ ও মানসিক অবসাদে কয়েকজনের অকাল মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেন তারা। অনেক মালিক চাতালের জায়গা প্লট আকারে বিক্রি করে দিয়েছেন, আবার অনেক চাতাল পরিত্যক্ত অবস্থায় ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে।

ঢাকলহাটি, খোয়ারপাড় ও দিঘারপাড় এলাকার ব্যবসায়ী ফজর আলী, রহমত মিয়া ও সুলতান মুহম্মদ বলেন, চোখের সামনে একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে দেখেছেন তারা। তাদের অভিযোগ, ক্ষুদ্র চাতাল শিল্পকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না দিয়ে অটো রাইস মিলের প্রসারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক ব্যবসায়ী এখনো ব্যাংক ঋণের দায়ে পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন।

শেরপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আরিফ হোসেন বলেন, একসময় শেরপুরের অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল চাতাল শিল্প। বর্তমানে এ শিল্পের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে জেলায় চাতাল শিল্প পুরোপুরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জানবেই না, শেরপুরে একসময় চাতাল শিল্প নামে একটি সমৃদ্ধ শিল্পখাত ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *